1. [email protected] : Hasan Mahmud Ripon : Hasan Mahmud Ripon
  2. [email protected] : AR Rahman : A R Rahman
'আমার কোন আবদারের জায়গা ছিল না' | News Bangladesh 24
সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

‘আমার কোন আবদারের জায়গা ছিল না’

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৯৭৯ টাইম ভিউ
শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ
শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন। এইদিন শহীদ হন বিশিষ্ট সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, যিনি স্বাধীনতার পক্ষে ‘শিলালিপি’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন।

তৎকালীন দেশের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘শিলালিপি’ ওইসময় সকলেরই নজর কেড়েছিল। সেলিনা পারভীন তার পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, কাপড়চোপড় এবং হাতখরচের টাকা সরবরাহ করতেন। এসব কিছুই তাকে শত্রুদের চক্ষুশূল করে তুলেছিল। যার প্রতিদান তাকে দিতে হয়েছে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে। সেলিনা পারভীনকে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায় একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বর। সেই সময় তার একমাত্র সন্তান সুমন জাহিদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। মায়ের শহীদ হওয়ার ঘটনা, মায়ের অনুপস্থিতিতে বেড়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশ নিয়ে নিজের ভাবনা বিষয়ে সমকাল অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন সুমন জাহিদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তাসলিমা তামান্না

সমকাল: আপনার মায়ের শহীদ হওয়ার ঘটনাটি বলুন?

সুমন জাহিদ: সেদিন ছিল ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। আমরা থাকতাম সিদ্ধেশ্বরীতে, ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডে। আমাদের বাসায় মা, আমি আর উজির মামা থাকতাম। সকালের দিকে হঠাৎ দূরে একটা গাড়ির আওয়াজ হলো। আমাদের বাসার উল্টো দিকে খান আতার বাসার সামনে ই.পি. আর. টিসি-এর ফিয়াট মাইক্রোবাস ও লরি থামে। সেই বাসার মেইন গেইট ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল কিছু লোক। আমরা তিনজন ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে এই দৃশ্যটা দেখি। কিছুক্ষণ পরে গাড়িটি আমাদের বাসার সামনে এসে থামে। আমাদের ফ্ল্যাট কোনটা তা জেনে লোকগুলো আমাদের দরজায় নক করে। আম্মা দরজা খুলে দেন। এ সময় আম্মার সঙ্গে লোকগুলোর বেশ কিছু কথা হয়। আমি আর মামা ততক্ষণে সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়েছি। লোকগুলো আমাদের দেখে বন্দুক তাক করে। আম্মা আমাদের ডেকে লোকগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর লোকগুলো আম্মাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। আম্মা প্রথমে রাজি না হলেও ওদের জোরাজুরিতে বলেন, ‘আপনারা অপেক্ষা করুন। আমি শাড়ি বদলে আসি।’ ওরা বাধা দিয়ে বলে, ‘দরকার নেই। গাড়িতে করে যাবেন আর আসবেন।’ আমিও তখন আম্মার সঙ্গে যেতে চাই। কিন্তু লোকগুলো আমাকে ধমক দিয়ে বলে, ‘বাচ্চা লোক, নেহি জ্যায়েগা।’ মা আমার মাথা ও গালে হাত বুলান। আমাকে বলেন, ‘সুমন তুমি মামার সাথে খেয়ে নিও। আমি যাব, আর চলে আসব।’—এই ছিল আমার জীবনে আম্মার কাছ থেকে শোনা শেষ কথা! এরপর লোকগুলো আম্মার কোমরে গোঁজা গামছা দিয়ে তার চোখ বাঁধল। হাতও পিছমোড়া করে বাঁধল। তারপর আম্মাকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল। সেই যে আম্মা গেলেন, আর কোনদিন ফিরলেন না! পরে অন্যদের কাছে জেনেছি, ১৮ ডিসেম্বর আমার মায়ের লাশ পাওয়া যায়, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। যেদিন আম্মাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তার পরনে ছিল সাদা শাড়ি-ব্লাউজ, স্কার্ফ, পায়ে সাদা জুতা ও মোজা। ফলে বধ্যভূমিতে অনেক শহীদদের মধ্যেও আমার আত্মীয়রা মাকে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন।

সমকাল: মায়ের সঙ্গে আপনার বিশেষ কোন স্মৃতি?

সুমন জাহিদ: মায়ের সঙ্গে আমার সুখস্মৃতিই বেশি। মা সবসময় আমাকে স্যান্ডেল পরিয়ে রাখতেন। খালি পায়ে হাঁটতে দিতেন না। কিন্তু একদিন সকাল বেলায় পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিয়ে খালি পায়ে বাইরে নিয়ে গেলেন। আমি বললাম, ‘আম্মা আমি তো খালি পায়।’ আম্মা বললেন, ‘দেখ; ভাষার জন্য সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত জীবন দিয়েছেন। তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাতে আমরা শহীদ মিনারে যাব। তাহলে এইটুকু কষ্ট কি আমরা সহ্য করতে পারব না?’

আরেকটা ঘটনা মনে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। রেসকোর্স ময়দানে মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম, চারিদিক লোকে লোকারণ্য। সবার হাতে বাঁশের লাঠি। আর সেই লাঠি হাতে সবাই একটা করে বাড়ি দিচ্ছে আর ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিচ্ছে। যখন নেতা মঞ্চে ওঠলেন, সব শব্দ থেমে গেল। যখন উনি ভাষণ দিচ্ছিলেন চারদিকে পিনপতন নিরবতা। ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছিল। আমি অবাক হয়ে এত কাছ থেকে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার দেখছিলাম।

এছাড়া দৈনন্দিন জীবনের নানা স্মৃতি তো রয়েছেই। আমি অবাক হয়ে এখন ভাবি—ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে একজন নারী, যিনি ছিলেন একজন সিঙ্গেল মাদার, তিনি কিভাবে একই সঙ্গে সংসার-সন্তানকে আগলে রাখার পাশাপাশি একটা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করতেন, আবার নিজে আরেকটি পত্রিকা বের করতেন!

সমকাল: মায়ের অনুপস্থিতিতে আপনার বেড়ে ওঠা…

সুমন জাহিদ: বেশিরভাগ শহীদ সন্তানরাও বাবা হারিয়েছেন একাত্তরে। বাবাহারা সেইসব সন্তানদের আগলে রেখেছেন মায়েরা। আমারটা একেবারেই ভিন্ন। বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনোই হয়নি। কারণ আমার যখন দু’বছর বয়স তখন আমার বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মা যখন শহীদ হলেন দেশে তখন নানারকম অস্থিরতা, কারো এমন আর্থিক সঙ্গতি ছিল না যে অনাথের ছেলে পালবে। সেইসময় আমার মামা অধ্যাপক ড. শাহাবুদ্দীন আমার যাবতীয় দায়িত্ব নেন। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত আমার লেখাপড়ার খরচ উনি বহন করেন। এর আগে একবার এই আত্মীয়ের বাসায়, আরেকবার অন্য আত্মীয়ের বাসায়—এভাবে থাকতাম। কেউ রাখতেও চাইত না। মামা আমার দায়িত্ব নেওয়ার পরে আমি হোস্টেলে থেকেছি। ছুটিতে অন্য বন্ধুরা দেশের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে গেছে, কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। আমার কোন আবদারের জায়গা ছিল না। এমনও দিন গেছে, যখন একা একা আমি বালিশে মুখ গুঁজে কান্না করেছি। এইসব কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না!

সমকাল: শহীদ বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীন দেশের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন—সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

সুমন জাহিদ: প্রজন্ম-৭১ নামে স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের সন্তানদের যে সংগঠন আছে সেখানে আমাদের একটা কথা আছে, তোমাদের যা বলার ছিল তা কি বলছে বাংলাদেশ? একাত্তরের শহীদরা যে বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ কিন্তু এটা না। এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা নেই। খুন, রাহাজানি লেগেই আছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর দরিদ্ররা হচ্ছে আরও দরিদ্র। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু রায় বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারব কি-না জানি না। আমার মাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও তার সঙ্গীরা। তার বিচার হয়েছে। কিন্তু সে পালিয়ে আছে লন্ডনে। ধরা দিচ্ছে না। যখন একটি রাজাকারও এই দেশে থাকবে না বা তাদের শাস্তি বাস্তবায়িত হবে তখন বলতে পারব, কিছুটা হলেও শহীদদের আত্মা শান্তি পেয়েছে।

সমকাল: অভিযোগ আছে, যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারাই ইতিহাস বিকৃত করতে চায়—এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সুমন জাহিদ: ‘৭৫-এর পর থেকে ‘৯৫ পর্যন্ত এদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কে স্বাধীনতার ঘোষক, কে না, স্বাধীনতার কে ডাক দিয়েছিল—এসব নানা ইস্যু ছিল। যেই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব তাদের। এটা প্রকাশ করা, মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তাদের। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন বিতর্ক থাকা উচিত নয়। এটা থাকবে সকল রাজনীতির ঊর্ধ্বে।

শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের নামে সড়কের নামকরণ-সমকাল
সমকাল: আপনার মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে আপনি কাজ করছেন, এসব করতে গিয়ে ঠিক কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন?

সুমন জাহিদ: মায়ের স্বীকৃতি, মায়ের সম্মান—এগুলো রক্ষা কিংবা পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। কিন্তু এগুলো আমাদের নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। যেমন-আমার মা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, তার স্মৃতি মানুষের কছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মগবাজার থেকে মৌচাক সড়কের নামকরণ প্রতিষ্ঠা করতে নয় বছর সময় লেগেছে আমার। স্মারকগ্রস্থ প্রকাশ করতেও একইরকম সময় লেগেছে।

একটা কষ্টের কথা বলি। একাত্তরে আত্মত্যাগ করা সব শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে আমি একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারটির নামকরণ যাতে ‘একাত্তরের শহীদ স্মৃতি উড়ালসড়ক’ হয় এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বারবার যোগাযোগ করেছি, চিঠি দিয়েছি, বিভিন্ন পত্রিকায় আমার প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, কিন্তু এটার কোন সাড়া পাইনি।

সমকাল: সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে?

সুমন জাহিদ: আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, মুক্তি পাইনি। মুক্তি পাইনি বলেই এখনও অনেক সংগঠন আন্দোলন করে যাচ্ছে। কিছু আদায় করতে গেলে মাঠে-ঘাটে কোমর বেঁধে নামছে, অবস্থান ধর্মঘট করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন ১৪ ডিসেম্বর আসলে শহীদ পরিবারদের ডেকে নানারকম প্রশ্ন করতেন, পরামর্শ নিতেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর উনাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে রাখা হয়েছে যে উনি আর আমাদের ডাকেন না। এখন ১৪ ডিসেম্বর সকালে আমরা যাই। স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকি। উনি সামান্য সময়ের জন্য আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন, যেটা আমাদের খুব ব্যথিত করে! আমরা চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শহীদ পরিবারদের ডাকুক, তাদের কী দরকার তা জানুক। দেশগড়ার ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শও নেওয়া হোক।

পোস্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2020 newsbangladesh24.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com